স্বামীর মৃত্যুতে ইদ্দত ও হিদাদ: ইসলামের শাশ্বত বিধান ও প্রয়োজনীয় মাসআলা
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। জীবনের প্রতিটি বাঁকে, বিশেষ করে প্রিয়জন হারানোর মতো কঠিন মুহূর্তেও ইসলাম আমাদের সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান করে। স্বামীর মৃত্যু একজন স্ত্রীর জীবনে সবচেয়ে বড় শোক ও পরীক্ষার সময়। এই সময় আল্লাহ তায়ালা শোক পালন বা 'হিদাদ'-এর বিধান দিয়েছেন। অনেকের মনে প্রশ্ন থাকে, এই সময়ে সাজসজ্জা বা অলংকার ব্যবহারের বিধান কী? আজকের নিবন্ধে আমরা কোরআন, হাদিস এবং ফিকহে হানাফীর অকাট্য দলিলের আলোকে বিস্তারিত আলোচনা করব।
ইদ্দত কী এবং এর গুরুত্ব কতটুকু?
ইদ্দত হলো সেই নির্দিষ্ট সময়, যা একজন নারীকে তার স্বামীর মৃত্যুর পর বা তালাকের পর অতিবাহিত করতে হয়। এটি কেবল একটি ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে গভীর সামাজিক ও পারিবারিক তাৎপর্য। বিশেষ করে স্বামীর মৃত্যুর পর শোক পালনের যে বিধান রয়েছে, তাকে ইসলামী পরিভাষায় 'হিদাদ' বলা হয়। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, "তোমাদের মধ্যে যারা মৃত্যুবরণ করে এবং স্ত্রীদের রেখে যায়, ওই স্ত্রীগণ নিজেদেরকে চার মাস দশ দিন অপেক্ষায় রাখবে" (সূরা আল-বাকারাহ: ২৩৪)। এই সময়সীমা পালন করা প্রতিটি মুসলিম নারীর জন্য ওয়াজিব।
হিদাদ বা শোক পালনের অর্থ ও তাৎপর্য
হিদাদ বা শোক পালনের মূল অর্থ হলো নিজেকে সাজসজ্জা ও আকর্ষণীয় রূপ থেকে দূরে রাখা। এটি মূলত প্রিয় স্বামীর বিয়োগব্যথায় শোক প্রকাশের একটি মাধ্যম। এই সময় নারী সাধারণ জীবনযাপন করবেন, কিন্তু কোনো ধরনের বিলাসিতা বা সৌন্দর্য প্রদর্শন করবেন না। ইসলামের দৃষ্টিতে এই সময়টি ইবাদত ও ধৈর্যের একটি বিশেষ অধ্যায়।
অলংকার বর্জন কি আবশ্যক?
অনেকেই মনে করেন, অলংকার পরা হয়তো সাধারণ একটি বিষয়। কিন্তু শরিয়তের দৃষ্টিতে এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। হাদিসের আলোকে বিষয়টি পরিষ্কার করা যাক। হজরত উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "যে নারীর স্বামী মারা গেছে, সে যেন কুসুম বা লাল রঙে রাঙানো কাপড় না পরে, এবং সে যেন কোনো অলংকার (আল-হুলিয়্যু) না পরে, এবং মেহেদি ও সুরমা ব্যবহার না করে" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং: ২৩০৪)। এই হাদিসটি অত্যন্ত স্পষ্ট যে, অলংকার বর্জন হিদাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ফিকহে হানাফীর দৃষ্টিভঙ্গি
হানাফী মাযহাবের নির্ভরযোগ্য কিতাবগুলোতে বিষয়টি নিয়ে অকাট্য ফয়সালা দেওয়া হয়েছে। 'হেদায়া' গ্রন্থের ভাষ্যমতে, ইদ্দত পালনকারী নারী সুগন্ধি, তেল, সুরমা, মেহেদি, রঙিন কাপড় এবং সব ধরনের অলংকার থেকে নিজেকে বিরত রাখবে। একইভাবে 'ফতোয়ায়ে আলমগীরী' এবং 'ফতোয়ায়ে শামী'-তে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হিদাদ বা শোক পালনের অর্থই হলো সাজসজ্জা, সুগন্ধি, অলংকার এবং সুরমা ব্যবহারের বর্জন। সুতরাং, নাকের ফুল, কানের দুল বা হাতের চুড়ি—যেকোনো কিছুই এই সময়ে পরা শরিয়তসম্মত নয়।
কেন অলংকার বর্জন করতে বলা হয়েছে?
ইসলামের প্রতিটি বিধানের পেছনেই হিকমত বা প্রজ্ঞা রয়েছে। অলংকার সাধারণত সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য ব্যবহৃত হয়। স্বামীর মৃত্যুতে শোক পালনকারী নারী যখন অলংকার বর্জন করেন, তখন তা তার অভ্যন্তরীণ শোকের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। এটি তাকে বিলাসিতা থেকে দূরে রেখে আল্লাহর ইবাদতে মনোযোগী হতে সাহায্য করে। এছাড়া, এটি সমাজকে একটি বার্তা দেয় যে, পরিবারটি শোকাহত।
সাধারণ ভুল ধারণা ও সংশোধন
আমাদের সমাজে প্রচলিত অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকে মনে করেন, শুধু সোনা বা রুপার অলংকার নিষেধ, কিন্তু কৃত্রিম অলংকার পরা যাবে। এটি সম্পূর্ণ ভুল। হাদিসে 'আল-হুলিয়্যু' শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যা যেকোনো ধরনের অলংকারকেই অন্তর্ভুক্ত করে। তাই নাকের ফুল থেকে শুরু করে গলার চেইন—সবই এই সময়ের জন্য বর্জনীয়।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, ইসলামের বিধান অত্যন্ত স্পষ্ট এবং যুক্তিসঙ্গত। স্বামীর মৃত্যুতে ইদ্দত পালনকারী নারীর জন্য চার মাস দশ দিন অলংকার বর্জন করা শুধু শরিয়তের আদেশই নয়, বরং এটি মৃত স্বামীর প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম। আমরা যেন আবেগপ্রবণ হয়ে বা সামাজিক লোকলজ্জার ভয়ে শরিয়তের এই অকাট্য বিধান লঙ্ঘন না করি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার এবং ইসলামের প্রতিটি বিধান মেনে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।