ভূমিকা: ইসলামের পূর্ণাঙ্গতা ও আমাদের পথচলা
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, 'আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম।' (সূরা আল-মায়িদা: ৩)। কিন্তু বর্তমান সময়ে আমরা কি সত্যিই সেই পূর্ণাঙ্গ ইসলামের ওপর অটল আছি? না কি বিভিন্ন মতবাদ, রাজনৈতিক স্বার্থ এবং আধুনিকতার দোহাই দিয়ে আমরা মূল পথ থেকে বিচ্যুত হচ্ছি? আজকের এই আলোচনায় আমরা বিদআত বিতর্ক, ইত্তেবায়ে রাসূল (সা.)-এর গুরুত্ব এবং বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সংকটের গভীরে প্রবেশ করব।
১. বিদআত ও মিলাদুন্নবী: একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলামে বিদআত শব্দটি নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে। বিদআত মানে হলো এমন নতুন কিছু তৈরি করা যা ইসলামের মূলনীতির পরিপন্থী। তবে কোনো কাজের মূল উদ্দেশ্য যদি শরীয়তসম্মত হয়, তবে শুধু কাইফিয়াত বা পদ্ধতির পরিবর্তনের কারণে তাকে ঢালাওভাবে 'বিদআত' বলা যুক্তিসঙ্গত নয়। যেমন, তারাবির নামাজ জামাতের সাথে পড়া রাসূল (সা.)-এর যুগে নিয়মিত ছিল না, কিন্তু হযরত ওমর (রা.)-এর সময় এটি সুন্নাহ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একইভাবে ঈদে মিলাদুন্নবীর মাহফিল যদি রাসূল (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা ও তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়ার উদ্দেশ্যে আয়োজিত হয়, তবে তাকে বিদআত বলে ফতোয়া দেওয়া মূর্খতার নামান্তর। ইসলাম আবেগ ও যুক্তি—উভয়ের সমন্বয় চায়।
২. রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও ঈমানি দায়বদ্ধতা
ইসলামী আইন বাস্তবায়ন নিয়ে বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক নেতাদের ভূমিকা অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ। অনেক সময় দেখা যায়, ক্ষমতার লোভে নেতারা ইসলামী আইন বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও ক্ষমতায় যাওয়ার পর পশ্চিমাদের তুষ্ট করতে সে পথ থেকে সরে আসেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন, 'যারা আল্লাহর অবতীর্ণ বিধান অনুযায়ী বিচার করে না, তারাই কাফির।' (সূরা আল-মায়িদা: ৪৪)। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ইসলামী আইন প্রয়োগ না করা কেবল রাজনৈতিক ব্যর্থতা নয়, বরং এটি ঈমানের পরিপন্থী একটি কাজ। একজন মুমিন শাসকের প্রথম কাজ হলো আল্লাহর বিধানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া।
৩. ইত্তেবায়ে রাসূল (সা.): ইসলামের একমাত্র সংস্করণ
বর্তমানে ইসলামের বিভিন্ন 'ভার্সন' বা সংস্করণ তৈরির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে—যেমন সুফিবাদী ইসলাম বা পলিটিক্যাল ইসলাম। অথচ ইসলাম একটিই, যা রাসূল (সা.) আমাদের রেখে গেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, 'তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।' (সূরা আল-আহযাব: ২১)। কিবলা পরিবর্তনের ঐতিহাসিক ঘটনা আমাদের শেখায় যে, রাসূল (সা.)-এর ইচ্ছা ও পছন্দই ইসলামের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি যা পছন্দ করেছেন, তা-ই ইসলাম। তাঁর অনুসরণের বাইরে কোনো আধ্যাত্মিকতা বা রাজনৈতিক দর্শন ইসলাম হতে পারে না।
৪. অন্য মতবাদের প্রভাব ও ইসলামের স্বকীয়তা
ইসলামের পূর্ণাঙ্গ বিধান বিদ্যমান থাকতে অন্য কোনো ধর্ম, সংস্কৃতি বা মতবাদ থেকে ভালো কিছু নেওয়ার প্রয়োজন নেই। হযরত ওমর (রা.)-এর একটি ঘটনা এ ক্ষেত্রে শিক্ষণীয়। তিনি একবার তাওরাত হাতে নিয়ে রাসূল (সা.)-এর কাছে এসেছিলেন। তখন রাসূল (সা.) অত্যন্ত রাগান্বিত হয়ে বলেছিলেন, 'হে ওমর! তুমি কি দ্বীনের ব্যাপারে সন্দিহান? আমি তোমাদের জন্য উজ্জ্বল ও পরিচ্ছন্ন শরীয়ত নিয়ে এসেছি।' (মুসনাদে আহমাদ)। অমুসলিমদের জ্ঞান-বিজ্ঞান গ্রহণ করা দোষের নয়, কিন্তু তাদের ধর্মীয় দর্শন বা জীবনপদ্ধতিকে ইসলামের সমান্তরালে নিয়ে আসা মুসলিম উম্মাহর জন্য আত্মঘাতী।
৫. শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতের করুণ দশা
একটি জাতির মেরুদণ্ড হলো তার শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থা। দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের প্রকৃত বিজ্ঞানী বা আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছে। বইয়ের পাতায় জ্ঞান থাকলেও নৈতিকতার চরম অভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অন্যদিকে, চিকিৎসা খাতেও মানবতার চেয়ে মুনাফা অর্জনের প্রবণতা বেশি। জাপানি এক প্রফেসরের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বলা যায়, এ দেশের মানুষ এখনো আল্লাহর রহমতে বেঁচে আছে, কারণ আমাদের সিস্টেমে অনেক ঘাটতি থাকলেও মানুষের হৃদয়ে এখনো কিছুটা মানবিকতা অবশিষ্ট আছে। তবে এই মানবিকতা টিকিয়ে রাখতে হলে আমাদের অবশ্যই ইসলামের নৈতিক শিক্ষায় ফিরে আসতে হবে।
উপসংহার: উত্তরণের পথ
পরিশেষে বলা যায়, আমাদের সব সমস্যার সমাধান নিহিত আছে কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক অনুধাবনে। আমরা যদি রাসূল (সা.)-এর ইত্তেবা বা অনুসরণে অবিচল থাকি এবং রাজনৈতিক, সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনে আল্লাহর বিধানকে প্রাধান্য দিই, তবেই আমরা এই সংকট থেকে মুক্তি পাব। বিদআত নিয়ে অহেতুক বিবাদে না জড়িয়ে ইসলামের মূল স্পিরিট বা আত্মাকে ধারণ করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তৌফিক দান করুন। আমীন।